বৃহস্পতিবার ১৪, মে ২০২৬

১৪ মে ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

কাপাসিয়ায় একই পরিবারের ৫ জন হত্যা: আপনজন কীভাবে হয়ে ওঠে ঘাতক?

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ মে ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

1699

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় মা, তিন সন্তান ও এক আত্মীয়কে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর শোক ও আলোড়ন। সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে একটি প্রশ্ন—একজন বাবা কীভাবে নিজের সন্তানদের হত্যার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

মানুষ সাধারণত আপনজনকে রক্ষা করতে নিজের জীবন পর্যন্ত ঝুঁকিতে ফেলেন। কিন্তু কখনো কখনো কিছু মানুষ এমন মানসিক অন্ধকারে হারিয়ে যান, যেখানে সম্পর্ক, ভালোবাসা কিংবা দায়িত্ববোধও কাজ করে না। তখন সবচেয়ে কাছের মানুষরাই হয়ে ওঠেন সহিংসতার শিকার।

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড সেই কঠিন বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন শিশুর বাবার বিরুদ্ধেই স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর তিনি নিজের ভাইকে ফোন করে বলেন, “সবাইকে শেষ করে দিয়েছি, আমাকে আর খুঁজে পাবে না।”

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ঘটনার আগের রাতেও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সন্তানদের নিয়ে দোকানে গিয়ে চকলেট ও চিপস কিনতে দেখা গেছে। এমন আচরণের পর হঠাৎ ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড মানুষের কাছে আরও বিস্ময়কর হয়ে উঠেছে।

 হত্যার মনস্তত্ত্ব কতটা জটিল

মনোবিশ্লেষক সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের মনকে তিনটি স্তরে ব্যাখ্যা করেছিলেন—ইড, ইগো ও সুপার ইগো। মানুষের ভেতরের আদিম প্রবৃত্তি, ক্ষোভ, রাগ ও তাৎক্ষণিক চাহিদার জায়গা হলো ‘ইড’। অন্যদিকে ‘ইগো’ বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করে এবং ‘সুপার ইগো’ নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিনের দাম্পত্য সংকট, মানসিক চাপ, হতাশা কিংবা দমিত ক্ষোভ একজন মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তখন আচরণের ওপর আবেগ ও রাগের প্রভাব বেড়ে যায়।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো হত্যাকাণ্ডকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পেছনে মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক নানা বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ হেলাল উদ্দিনের মতে, হত্যাকাণ্ড সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে—পরিকল্পিত এবং তাৎক্ষণিক আবেগ থেকে সংঘটিত। কাপাসিয়ার ঘটনাটি কোন ধরনের, সেটি তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির আচরণ দেখে তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে ঘোষণা দেওয়া ঠিক নয়। একজন মানুষের মানসিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য তার আচরণগত ইতিহাস, জীবনযাপন ও মানসিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে হয়।

 দাম্পত্য কলহ ও দীর্ঘদিনের অশান্তি

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি পরিবার নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে কাপাসিয়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। পেশায় তিনি প্রাইভেটকার চালক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ও তিন সন্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ চলছিল বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের দাবি, দ্বিতীয় বিয়ের ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। কয়েক মাস আগে স্ত্রীকে মারধরের ঘটনাও ঘটে, যার কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।

পরে স্ত্রী আবার সংসারে ফিরে এসে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একসঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির দিকে যায়।

হত্যার পর কেন স্বজনকে ফোন?

ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের ভাইকে ফোন করে হত্যার কথা জানান। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ভয়াবহ অপরাধ সংঘটনের পর অনেক সময় অপরাধী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তখন অপরাধবোধ, আতঙ্ক বা বাস্তবতার চাপ থেকে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

ডা. আহমেদ হেলাল উদ্দিন বলেন, হত্যার আগে ও পরে মানুষের মানসিক অবস্থা এক থাকে না। ঘটনার পর আবেগের তীব্রতা কমে এলে অপরাধবোধ বা ভয় তৈরি হতে পারে। অনেক সময় মানুষ মানসিক চাপ কমানোর জন্য পরিচিত কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক হত্যাকাণ্ডের পর আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়। কারণ, অপরাধের পর বাস্তবতায় ফিরে এসে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন অনেকেই।

 সমাজ ও পরিবারেরও দায়িত্ব রয়েছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম মনে করেন, পারিবারিক সহিংসতা সাধারণত হঠাৎ তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, দাম্পত্য অশান্তি ও সম্পর্কের টানাপোড়েন ধীরে ধীরে সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, পরিবারে জমে থাকা ক্ষোভ ও অসন্তোষ অনেক সময় ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। দেশে পারিবারিক সহিংসতা বাড়লেও এখনো কার্যকর মানসিক সহায়তা ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা খুব সীমিত।

অর্থনৈতিক চাপ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, মাদকাসক্তি ও পারিবারিক সংকট মানুষের মানসিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার, সমাজ, প্রতিবেশী ও ধর্মীয় নেতাদের সম্মিলিত উদ্যোগে পারিবারিক সংকট মোকাবিলায় সহমর্মিতা ও কাউন্সেলিংয়ের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

তবে কোনো মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণই এমন হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয় না। বরং এ ধরনের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, পরিবারের ভেতরের সংকট ও মানসিক অস্থিরতাকে কখনোই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

Link copied!