মঙ্গলবার ১৬, জুন ২০২৬

১৬ জুন ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের ওপর হতাশ নেতানিয়াহু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

1696

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে গম্ভীর মুখে বসে আছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরুর প্রাক্কালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জোরালো বাজি ধরে ছিলেন যে তিনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই যৌথ যুদ্ধ ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকারের পতন ডেকে আনবে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বিশেষ সামরিক জোটের মূল স্থপতি হিসেবে ইসরায়েলের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

কিন্তু যুদ্ধের নির্মম বাস্তব চিত্র নেতানিয়াহুর তৈরি করা সেই চকচকে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় একদমই এগোয়নি। ইরানে ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের পতন তো ঘটেইনি, উল্টো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এই অন্তহীন যুদ্ধ থেকে যত দ্রুত সম্ভব নিজেকে ও নিজের দেশকে বের করে নিয়ে আসতে চাইছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরান থেকে একপ্রকার কৌশলগতভাবে বিতাড়িত হয়ে প্রতিবেশী দেশ লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান সীমিত রাখতে বাধ্য হয়েছে।

কিন্তু নতুন এই রণক্ষেত্র লেবাননেও এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের তীব্র ঝামেলা ও কূটনৈতিক বিরোধ শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেবাননের ভেতরে আইডিএফের এই একতরফা অভিযানের একেবারেই পক্ষে নন; তবে নেতানিয়াহু নাছোড়বান্দা, তিনি চান যেকোনো মূল্যে লেবাননে আইডিএফের এই সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকুক। এই কৌশলগত ইস্যুতে একাধিকবার পর্দার আড়ালে তীব্র দ্বন্দ্ব হয়েছে দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে এবং একপর্যায়ে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় গালাগাল ও চরম ভর্ৎসনা করেছেন বলেও গুঞ্জন উঠেছে।

নেতানিয়াহু অবশ্য তাঁর পরম ‘বন্ধু’ ট্রাম্পের উদ্দেশে প্রকাশ্যে পাল্টা কোনো নেতিবাচক কথা বা মন্তব্য করেননি। ইসরায়েলের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারও নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক মিত্র যুক্তরাষ্ট্র কিংবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্পর্কে যেকোনো ধরনের মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছেন। কারণ, ওয়াশিংটন তাদের কৌশলগত নীতির কোনো সমালোচনা মোটেও পছন্দ করে না।

তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ও ঘরোয়া আলাপ-আলোচনায় ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের সেই গভীর হতাশা এখন পুরোপুরি স্পষ্ট ধরা পড়ছে। বিশেষ করে ‘ইসলামাবাদ মেমোর‌্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (Islamabad Memorandum of Understanding) নামে যে বিশেষ সমঝোতা চুক্তিটি আগামী ১৯ জুন ইরানের সাথে স্বাক্ষর করতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র, সেটিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ‘ভয়ঙ্কর’ ও আত্মঘাতী বলে মনে করছে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থী জোট সরকার। এই শাসক জোটের শরিক একটি দলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিশ্বখ্যাত সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে এ প্রসঙ্গে সরাসরি বলেন, “প্রস্তাবিত এই আন্তর্জাতিক চুক্তিটি যে ইসরায়েলের সামগ্রিক অস্তিত্বের জন্য ভয়ঙ্কর, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে ইসরায়েলের সেনাপ্রধান— কারোরই বিন্দুমাত্র দ্বিমত নেই।”

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর এই গভীর উদ্বেগের অন্যতম একটি বড় কারণ হলো লেবাননভিত্তিক শক্তিশালী সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। তিনি শুরুতে ভেবেছিলেন, মার্কিন বিমান হামলা ও আইডিএফের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের মূল ইসলামি সরকার এবং লেবাননে ইরানের প্রত্যক্ষ সমর্থনপুষ্ট মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ— উভয়েরই একযোগে পতন ঘটবে। কারণ দীর্ঘকাল ধরে এই দুই পক্ষই ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে এত সংঘাত, রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও ইরানের ইসলামি সরকার ও হিজবুল্লাহর পতনের কোনো লক্ষণ দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটছেন এবং লেবাননে অবিলম্বে হামলা বন্ধ করার জন্য তেল আবিবকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। হোয়াইট হাউজের সেই কড়া নির্দেশ অমান্য করে লেবাননে অনবরত সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখায় চলতি জুন মাসের শুরুর দিকেই নেতানিয়াহুকে ফোনে গালাগালি ও তীব্র ভর্ৎসনাও করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই নজিরবিহীন গালাগাল শোনার পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কয়েক দিন লেবাননে বিমান হামলা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন নেতানিয়াহু, কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপে পরের সপ্তাহ থেকেই ফের নতুন উদ্যোমে হামলা শুরুর নির্দেশ দেন তিনি।

গতকাল সোমবার ইসরায়েলের রাজধানী জেরুজালেমে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহুকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক এই নজিরবিহীন মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন এক আন্তর্জাতিক সাংবাদিক। জবাবে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নেতানিয়াহু বলেন, “তিনি (ট্রাম্প) হলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আর আমি হলাম স্বাধীন রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। অনেক সময় বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে আমাদের মতের মিল হয়, আবার অনেক সময় কিছু বিষয়ে হয়ও না। তবে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকদের নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব সম্পূর্ণ আমার।”

ইসরায়েলের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমানে মার্কিন প্রভাবশালী থিঙ্ক ট্যাংক সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিলের (Atlantic Council) সিনিয়র কর্মকর্তা ড্যান শাপিরো নেতানিয়াহুর এই কৌশলগত বক্তব্য সম্পর্কে রয়টার্সকে বলেন, “এটি হলো দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক স্বার্থগত মতপার্থক্যের একটি বেশ স্পষ্ট ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নেতানিয়াহু এই মুহূর্তে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত (ইরান) চুক্তিটির প্রকাশ্যে কড়া বিরোধিতা না করার আপ্রাণ চেষ্টা করবেন, যাতে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কোনো বড় বিবাদে জড়াতে না হয়; কিন্তু তিনি তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে এই সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ঠিকই দিয়ে রাখলেন যে ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে মোটেও বাধ্য নয় এবং নিজেদের সুরক্ষায় ইসরায়েল তার সামরিক অধিকার পুরোপুরি সংরক্ষণ করে।”

ড্যান শাপিরো আরও উল্লেখ করেন, “তাছাড়া সামনেই ইসরায়েলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচন এবং দেশের ভেতরে বর্তমানে নেতানিয়াহুর প্রতি সাধারণ ভোটারদের সমর্থন একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে জীবনের বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি সময় পার করছেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।”

Link copied!