প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ০১:৫০ পিএম
1693
১৬ জুন ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির হারানো গৌরব ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা পুনর্বহাল করতে অবিলম্বে সৎ, যোগ্য ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ (বোর্ড অফ ডিরেক্টরস) গঠনের দাবি জানিয়েছে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে এ সংক্রান্ত ৭ দফা সংবলিত একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পর ফোরামের আহ্বায়ক ও প্রধান মুখপাত্র অধ্যাপক নুরুন্নবী মানিক সাংবাদিকদের সামনে এই দাবি জানান।
আজ দুপুর ১২টার দিকে মতিঝিলের দিলকুশায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গিয়ে জড়ো হন সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আসা আন্দোলনকারীরা। স্মারকলিপি প্রদান শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চত্বরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে নিজেদের যৌক্তিক দাবিগুলো তুলে ধরেন অধ্যাপক নুরুন্নবী মানিক।
তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের সাবেক বিতর্কিত চেয়ারম্যান খুরশেদ আলমের বিদায়ের পর বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে প্রাথমিক সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা এখনও অনেকটাই অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ব্যাংকটিকে পুরোদমে সচল করতে হলে দ্রুত একটি অত্যন্ত দক্ষ, সৎ ও পেশাদার পরিচালনা পরিষদ গঠন করতে হবে। এই নতুন পর্ষদে এমন সব ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাদের অতীতে আর্থিক স্বচ্ছতা ও পেশাগত যোগ্যতা প্রমাণিত এবং যারা কোনো ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি বা ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত জড়িত নন।’
ফোরামের আহ্বায়ক আরও অভিযোগ করে বলেন, বিগত স্বৈরাচারী আমলে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ বা অন্যান্য স্বার্থান্বেষী পক্ষ গায়ের জোরে ইসলামী ব্যাংকের যে বিপুল পরিমাণ শেয়ার জোরপূর্বক ও অবৈধ উপায়ে দখল করে নিয়েছিল, তা অবিলম্বে ব্যাংকের প্রকৃত ও আদি ওরিয়েন্টাল মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। ব্যাংকটিকে সব ধরণের রাজনৈতিক ও কর্পোরেট দখলদারিত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা গেলেই সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা পুনরায় শতভাগ ফিরে আসবে।
তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ব্যাংকের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে সচেতন গ্রাহক ফোরাম তাদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন রাজপথে অব্যাহত রাখবে। প্রশাসক নিয়োগের পর এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিতর্কমুক্ত পর্ষদ গঠনই আমাদের মূল লক্ষ্য, যাতে ব্যাংকটি তার আগের গৌরব ও আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য ফিরে পায়।
অধ্যাপক নুরুন্নবী মানিক আরও বলেন, ‘আজকে আমাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি একটি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী বৈঠকে ব্যস্ত থাকায় তাঁর পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ইসমাইল হোসেন আমাদের ৭ দফার স্মারকলিপিটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছেন। তিনি এটি আজই গভর্নরের টেবিলে পৌঁছে দেওয়ার জোরালো আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া আগামীকাল বুধবার আমাদের সাথে গভর্নরের একটি সরাসরি আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ ও বিস্তারিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কথা চূড়ান্ত রয়েছে।’
এর আগে, সকাল সাড়ে ১১টায় দিলকুশার ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে ফোরামের পক্ষ থেকে এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে ৭ দফা দাবি পড়ে শোনানো হয়।
সচেতন গ্রাহক ফোরামের উত্থাপিত ৭ দফা দাবিগুলো হলো:
১. যোগ্য ও পেশাদার বোর্ড গঠন: অতি দ্রুত যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে স্বচ্ছ আলোচনার ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন ও পেশাদার বোর্ড অফ ডিরেক্টরস গঠন করতে হবে।
২. আদি মালিকানা ফেরত: ২০১৭ সালে রাজনৈতিক গায়ের জোরে ও গোয়েন্দা নজরদারিতে কেড়ে নেওয়া মালিকানা ব্যাংকের প্রকৃত ও আদি উদ্যোক্তা-মালিকদের কাছে অবিলম্বে হস্তান্তর করতে হবে।
৩. লুটেরাদের বিচার:এস আলম গ্রুপসহ যারা ব্যাংক থেকে ভুয়া ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. অপপ্রচার রোধ: ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ও আমানতকারীদের সুরক্ষায় যেকোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বন্ধ করতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলমান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মনগড়া অপপ্রচার রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার: বিশেষ ব্যাংকিং টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এস আলমের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও বিক্রয় করে ব্যাংকের বকেয়া ঋণ পরিশোধের আইনি ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. আজীবন নিষিদ্ধের আইন: ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮(ক) ধারা জরুরি সংশোধন করে চিহ্নিত ব্যাংক লুটপাটকারী, ডিফল্টার ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেশের ব্যাংকিং খাতের পরিচালনা পর্ষদে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করতে হবে।
৭. বক্তব্য প্রত্যাহার: জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য অবিলম্বে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রত্যাহার করতে হবে।