প্রকাশিত: ০৯ জুন ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
1697
১৪ জুন ২০২৬, ০১:০৩ এএম
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি আলোচিত শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যখন পুরো এলাকা এখনও গভীর শোক ও উদ্বেগে আচ্ছন্ন, ঠিক সেই সময় একই এলাকায় আরও এক শিশুর রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নতুন করে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। নিখোঁজ হওয়া এই শিশুটির নাম ইব্রাহিম (৫)। পরিবারের দাবি, ঘটনার আগে ও পরে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে এমন কিছু রহস্যময় তথ্য উঠে এসেছে, যা তাদের অপহরণের সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন অন্য দিনের মতোই বাসার সামনে খেলাধুলা করছিল শিশু ইব্রাহিম। সন্ধ্যার পরও যখন সে বাড়িতে ফিরে আসেনি, তখন পরিবারের সদস্যরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। আশপাশে কোথাও তার সন্ধান না পেয়ে তারা তাৎক্ষণিকভাবে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যবেক্ষণ করেন।
ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৭টা ২১ মিনিটে ইব্রাহিম দ্রুত দৌড়ে তাদের ভবনের ভেতরে প্রবেশ করছে। ঠিক একই সময় তার পেছনে একজন ব্যক্তিকেও অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে ওই ভবনে ঢুকতে দেখা যায়। পরিবারের দাবি, ভবনের ভেতরে প্রবেশের কিছুক্ষণ পরই নিচতলার দিক থেকে এক শিশুর আর্তচিৎকারের মতো শব্দ শোনা যায়। এরপর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ওই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে দ্রুতগতিতে ভবন থেকে বের হয়ে চলে যেতে দেখা যায়। কিন্তু এরপর আর কোথাও ইব্রাহিমকে দেখা যায়নি এবং এই ঘটনার পর থেকেই শিশুটি সম্পূর্ণ নিখোঁজ রয়েছে
নিখোঁজ শিশুটির স্বজনদের সরাসরি অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া ওই ব্যক্তিটি অন্য কেউ নন, খোদ বাড়ির মালিকের ছেলে। যদিও পুলিশ এখনও এই গুরুতর অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেনি। তবে পরিবার বলছে, ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং ঘটনার সুনির্দিষ্ট সময়কাল বিবেচনায় তাদের সন্দেহের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ওই ব্যক্তিই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইব্রাহিমের পরিবারের বাসা থেকে মাত্র কয়েক গলি দূরেই ছিল শিশু রামিসার বাসা, যে সম্প্রতি এক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। ফলে একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে শিশুদের ঘিরে একের পর এক অপরাধের ঘটনায় স্থানীয় এলাকাবাসীর মনে আতঙ্ক বহুগুণ বেড়ে গেছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা যে বহুতল ভবনে বসবাস করেন, সেখানে ছাদে সাধারণত কাউকে যেতে দেওয়া হয় না এবং ছাদটি সবসময় কঠোরভাবে তালাবদ্ধ রাখা হয়। ছাদের চাবিও সার্বক্ষণিকভাবে থাকে বাড়ির মালিকের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে। এমন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে ভবনের ভেতর থেকে একটি শিশু কীভাবে হঠাৎ নিখোঁজ হলো, সেটিই এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইব্রাহিমের বাবা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,“আমরা প্রায় ১০ বছর ধরে এই এলাকায় অত্যন্ত শান্তিতে বসবাস করছি। কারও সঙ্গে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা বিরোধ নেই। হঠাৎ করে আমার নিষ্পাপ সন্তানটি কোথায় হারিয়ে গেল, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। আমরা শুধু চাই, আমার ছেলেকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় আমাদের বুকে ফিরে পাই।”
তিনি আরও গুরুতর অভিযোগ করে বলেন, বাড়িওয়ালার দুই ছেলে দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত এবং অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাদের তীব্র আর্থিক সংকট ও নেশার টাকা জোগাড়ের চরম প্রয়োজন থেকেই এই পরিকল্পিত অপহরণের ঘটনা ঘটতে পারে বলে পরিবারের প্রবল সন্দেহ। তবে এই অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিখোঁজের ঘটনাটি পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যে সংগ্রহ করে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় নিয়েই চিরুনি অভিযান ও তদন্ত চালানো হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
মিরপুর বিভাগের দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট কারও বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে তা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে তদন্তে কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদসহ প্রয়োজনীয় সকল আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে তদন্তের ইতিবাচক অগ্রগতির দিকেই চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে ইব্রাহিমের পরিবার ও পুরো পল্লবী এলাকার সর্বস্তরের অভিভাবক।