শনিবার ১৩, জুন ২০২৬

১৩ জুন ২০২৬, ০৯:০১ পিএম

টাকা ধার না দেওয়ায় দুই আনা স্বর্ণের লোভে শিশুকে হত্যা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম

1695

শিশু রাকা মুনি

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে মাত্র দুই আনা ওজনের স্বর্ণের কানের দুলের লোভে সাড়ে ছয় বছর বয়সী ফুটফুটে শিশু রাকা মুনিকে নৃশংসভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৫টার দিকে সান্তাহার পৌর শহরের সাহেবপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে নিখোঁজ হয় শিশুটি। নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টা পর প্রতিবেশীর বাড়ির মুরগির ঘর থেকে তার বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

নিহত রাকা মুনি সান্তাহার পৌর শহরের সাহেবপাড়া এলাকার রায়হান উদ্দিনের মেয়ে। সে স্থানীয় একটি মাদরাসার প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চরম পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে বেশ কিছুদিন আগে রাকা মুনির মা তার বাবাকে তালাক দিয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে ফুফু লিপি আক্তারের কাছেই মাতৃহীন রাকা মুনি পরম স্নেহে বড় হচ্ছিল। তার বাবা রায়হান উদ্দিন জীবিকার তাগিদে অধিকাংশ সময় সান্তাহারের বাইরে থাকায় ফুফুর ঘরেই তার লালন-পালন চলছিল।

প্রতিদিনের মতো গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ি থেকে মাত্র অল্প দূরের একটি শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে যায় রাকা। কিন্তু সন্ধ্যা পার হয়ে দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও সে বাড়িতে ফিরে না আসায় ফুফুসহ পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। চারদিকে ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করে তার কোনো সন্ধান না পেয়ে রাতেই সান্তাহার পুলিশ ফাঁড়িতে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পরিবার।

নিখোঁজের পর পাড়ার বিভিন্ন স্থানে তল্লাশির একপর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবেশী আমজাদ হোসেনের গতিবিধি ও আচরণে চরম সন্দেহ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী আমজাদের বাড়িতে জোরপূর্বক তল্লাশি চালাতে গিয়ে তাঁর বাড়ির ভেতরের একটি মুরগির ঘরের কোণে প্লাস্টিকের বস্তার মুখ বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান। বস্তাটি খুলতেই ভেতরে শিশু রাকা মুনির নিথর ও রক্তাক্ত মরদেহ বেরিয়ে আসে।

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত বিক্ষুব্ধ জনতা ঘাতক আমজাদের বাড়িতে চড়াও হয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালায়। খবর পেয়ে আদমদীঘি থানা ও সান্তাহার ফাঁড়ি পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

নিহত শিশুটির ফুফু লিপি আক্তার অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “আমার ভাই অনেক কষ্ট করে রাকা মুনিকে দুই আনা ওজনের এক জোড়া স্বর্ণের কানের দুল বানিয়ে দিয়েছিল, যা সে সবসময় কানে পরে থাকত। গত কয়েকদিন ধরে প্রতিবেশী আমজাদ হোসেন আমাদের কাছে কিছু টাকা ধার চাচ্ছিল। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য না থাকায় আমরা টাকা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করি। এতে সে আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। টাকা ধার না পেয়ে এবং রাকার কানের ওই দুই আনা স্বর্ণের দুলের লোভে সে আমার মাতৃহীন ছোট্ট ভাতিজিকে ফুসলিয়ে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমরা এই নরপশুদের ফাঁসি চাই।”

এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে তিনজনকে আটক করেছে আদমদীঘি থানা পুলিশ। আটক ব্যক্তিরা হলেন—সাহেবপাড়া এলাকার আবুলের ছেলে প্রধান অভিযুক্ত আমজাদ হোসেন (৪২), তার স্ত্রী বন্যা বেগম (৩০) এবং তাদের সহযোগী প্রতিবেশী আব্দুল কাদেরের ছেলে বাবু (৪০)।

সান্তাহার পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক খন্দকার ফরিদ হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “প্রাথমিক তদন্ত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, কানের স্বর্ণের দুল চুরি ও পূর্ব শত্রুতার জেরেই শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

আদমদীঘি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান মিয়া বলেন, “আটকের সময় উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে আহত হওয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বর্তমানে পুলিশের কড়া পাহারায় নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে তারা হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তবে তারা হাসপাতাল থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফেরার পর রিমান্ডে এনে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই নৃশংস ঘটনার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না তা বের করা হবে। এ ঘটনায় রাকার বাবা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।”

Link copied!