শনিবার ১৩, জুন ২০২৬

১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম

সাপে কাটার পর ঝাড়ফুঁক করে সময় নষ্ট, প্রাণ গেল মাদরাসাছাত্র ইফাতের

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬, ১২:২৪ পিএম

1699

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় বিষধর সাপের কামড়ে ইফাত মিয়া (১৩) নামে এক মাদরাসাছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার (১২ জুন) জুমার নামাজের আগে বাড়ির পাশের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে সে সাপের কামড়ের শিকার হয়। তবে সাপে কাটার পরপরই তাকে দ্রুত হাসপাতালে না নিয়ে, ওঝার ঝাড়ফুঁক ও পাথর দিয়ে কবিরাজি চিকিৎসা করানোর ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

মৃত ইফাত মিয়া উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের নামা হাতিপাগাড় এলাকার দেলোয়ার হোসেন দেলু মিয়ার ছেলে। সে স্থানীয় একটি মাদরাসার শিক্ষার্থী ছিল।

পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দা সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের আগে ইফাত তার সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির পাশের পুকুরে গোসল করতে যাচ্ছিল। পুকুর ঘাটে নামার ঠিক আগমুহূর্তে ঝোপের মধ্যে থাকা একটি বিষধর সাপ হঠাৎ তার পায়ে কামড় দেয়। যন্ত্রণায় চিৎকার করে সে দ্রুত বাড়িতে ফিরে এসে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানায়।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে ইফাতের বাবা দেলোয়ার হোসেন দেলু মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “আমার ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই মাদরাসায় পড়াশোনা করেছে। প্রথমে সে খরখরিয়া কান্দা মাদরাসায় এবং পরবর্তীতে নালিতাবাড়ী উপজেলার আরাইআনি মাখরজুল কিবলা ইসলামিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা করছিল। শুক্রবার জুমার আগে গোসল করতে গিয়ে তাকে সাপে কামড়ায়। সে এসে আমাকে বলার পর আমি তাৎক্ষণিকভাবে তার পায়ে একটি শক্ত বাঁধন (রশি) দেই। কিন্তু এরপর হাসপাতালে না নিয়ে আমাদের এলাকার স্থানীয় একটি খ্রিস্টান মিশনে নিয়ে যাই; যেখানে সাপের বিষ নামানোর জন্য তথাকথিত ‘বিষ পাথর’ দিয়ে গ্রামীণ চিকিৎসা দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন, “সেখানে নেওয়ার পর শুরুতে কোনো নার্স বা দায়িত্বরত ব্যক্তি ছিল না। পরে অনেক ডাকাডাকি করে লোক এনে পাথর দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা হয়। কিছুক্ষণ পর আমার ছেলে বলে সে নাকি একটু ভালো বোধ করছে। ছেলের কথায় আশ্বস্ত হয়ে আমরা তার পায়ের বাঁধনটি খুলে দেই। এরপর তাকে সেখানে ভর্তি করানোর আনুষঙ্গিক কাজ ও টাকা নিতে আমি কিছু সময়ের জন্য বাড়িতে আসি। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর মিশনে ফিরে গিয়ে দেখি ছেলের অবস্থা চরম আশঙ্কাজনক, শরীর অবশ হয়ে আসছে। তখন তড়িঘড়ি করে তাকে নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”

নালিতাবাড়ী থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ও নয়াবিল ইউনিয়নের সহকারী বিট অফিসার হাসিম এই বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “দুপুরে সাপে কাটার পর ভুক্তভোগী পরিবারটি সচেতনতার অভাবে শিশুটিকে সরাসরি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়নি। তারা অবৈজ্ঞানিক ঝাড়ফুঁক ও পাথর দিয়ে বিষ নামানোর জন্য অন্যত্র নিয়ে দীর্ঘ সময় নষ্ট করেছে। সাপের বিষ রক্তে ছড়িয়ে পড়ার পর শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আনায় শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।”

নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হুমায়ুন নূর জানান, “বিষধর সাপে কাটা ওই কিশোর রোগীকে আমাদের জরুরি বিভাগে আনার অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। আমরা প্রয়োজনীয় ইসিজিসহ অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। সাপে কাটার পর প্রথম এক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (গোল্ডেন আওয়ার), এই সময়ে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের পেছনে সময় নষ্ট না করে সরাসরি হাসপাতালে এনে অ্যান্টিভেনম দিলে ছেলেটিকে অনায়াসে বাঁচানো সম্ভব হতো।”

Link copied!