রবিবার ১৪, জুন ২০২৬

১৪ জুন ২০২৬, ০১:০০ এএম

জ্যৈষ্ঠ : মধুমাসের গান

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

1700

বাংলা বারো মাসের মধ্যে জ্যৈষ্ঠ মাস এক অনন্য অধ্যায়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের মাঝেও এই মাসটি বাঙালির মনে এক বিশেষ আনন্দ ও উৎসাহের সঞ্চার করে। কারণ এই মাসেই প্রকৃতি তার শ্রেষ্ঠ রসালো উপহার নিয়ে হাজির হয় মানুষের দ্বারে। পাকা আম, কাঁঠাল, লিচু, জামসহ নানান মিষ্টি ফলের সম্ভারে ভরে ওঠে বাংলার মাঠঘাট, বাজার আর গৃহস্থের আঙিনা। তাই তো বাংলায় জ্যৈষ্ঠ মাসের আরেক নাম 'মধুমাস' — ফলের মধুতে পরিপূর্ণ এক অপূর্ব মাস।

মধুমাসের নামকরণ ও পরিচয়:

বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী জ্যৈষ্ঠ হলো গ্রীষ্মকালের দ্বিতীয় মাস। ইংরেজি মে থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই মাস পড়ে। জ্যৈষ্ঠ মাসকে 'মধুমাস' বলা হয় কারণ এই মাসে বাংলার প্রকৃতি মিষ্টি ফলে ভরপুর থাকে। সংস্কৃত 'মধু' শব্দের অর্থ মিষ্টি বা মধু — আর সেই মাধুর্যেই বছরের এই সময়টুকু ভরে ওঠে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে কবি জীবনানন্দ দাশ - সকলেই বাংলার এই ঋতুকে নিয়ে কবিতা ও গান রচনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যে জ্যৈষ্ঠ মাস মানেই আমের সুমিষ্ট গন্ধ, কোকিলের কুহুতান এবং উত্তপ্ত দুপুরে মিষ্টি ফলের রসে প্রশান্তির এক চিরন্তন ছবি।

ফলের রাজ্যে জ্যৈষ্ঠের সমারোহ:

জ্যৈষ্ঠ মাসকে বাংলার ফলের মাস বলাটা মোটেই অত্যুক্তি নয়। এই সময়ে বাংলার মাটি তার শ্রেষ্ঠ উপহার নিয়ে হাজির হয়। প্রতিটি ফলের নিজস্ব গন্ধ, রস ও স্বাদে বাংলার মধুমাস যেন এক অনন্য ফলের উৎসবে পরিণত হয়।

আম - ফলের রাজা:

জ্যৈষ্ঠ মাসে আম সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় বলে বাংলায় এই মাসকে 'আমের মাস'ও বলা হয়। ফজলি, ল্যাংড়া, হিমসাগর, আশ্বিনা, গোলাপখাস, আম্রপালিসহ অসংখ্য প্রজাতির আম এই মাসে বাজারে আসে। বাংলাদেশের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বিশ্বখ্যাত। মৌলভীবাজার, নাটোর ও দিনাজপুরেও প্রচুর আম উৎপাদিত হয়। পাশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদের আমও সুবিখ্যাত। আম শুধু কাঁচা বা পাকা অবস্থায় খাওয়া হয় না - আমের আচার, আমসত্ত্ব, আমচুর, আমের মোরব্বা বাঙালির রান্নাঘরের এক অপরিহার্য অংশ।

কাঁঠাল - জাতীয় ফল:

কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল এবং জ্যৈষ্ঠ মাসেই সবচেয়ে বেশি পাকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাছের ফল হিসেবে পরিচিত কাঁঠাল পুষ্টিগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কাঁচা কাঁঠালকে 'এঁচোড়' বলা হয় এবং এটি তরকারি হিসেবে রান্না করা হয়। পাকা কাঁঠালের কোষ সরাসরি খাওয়া হয় এবং এটি থেকে কাঁঠালের পাটালি, কাঁঠালের মোরব্বা তৈরি হয়। কাঁঠালের বিচিও সিদ্ধ করে বা ভেজে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।

লিচু, জাম ও অন্যান্য ফল:

লিচু জ্যৈষ্ঠের আরেক প্রধান আকর্ষণ। রসে ভরা মিষ্টি এই ফল শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের প্রিয়। বাংলাদেশের দিনাজপুরের লিচু বিখ্যাত। জাম বা কালোজাম এই মাসে থোকায় থোকায় পাকে এবং এর কষাটে-মিষ্টি স্বাদ শরীরে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যোগায়। আনারস, বেল, পেঁপে, লটকন, দেশি গাব, করমচা -এই সবই জ্যৈষ্ঠ মাসের বিশেষ উপহার। বিশেষত বেল শরবত গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে অতুলনীয়।

জ্যৈষ্ঠের ফুল ও প্রকৃতি:
শুধু ফলই নয়, ফুলের দিক থেকেও জ্যৈষ্ঠ মাস বাংলার প্রকৃতিকে সাজিয়ে তোলে অপূর্ব রঙে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যেও প্রকৃতি যেন তার রঙিন বিছানা পেতে দেয়।

কৃষ্ণচূড়া : রাস্তার দুধারে লালে-লাল কৃষ্ণচূড়া গাছ জ্যৈষ্ঠ মাসের অন্যতম পরিচিত দৃশ্য। এর টকটকে লাল ফুল গরমের নীল আকাশের সাথে এক অপূর্ব বৈসাদৃশ্য তৈরি করে।

সোনালু : হলুদ রঙের সোনালু ফুল ঝরে পড়ে সোনার বৃষ্টির মতো। 'সোনার বাংলা'র এই ফুল যেন মধুমাসের সৌন্দর্যের প্রতীক।

জারুল ও হিজল : বেগুনি রঙের জারুল ফুল এবং হিজল ফুল বাংলার নদীতীর ও বিলের ধারে এই মাসে ফোটে। হাওর অঞ্চলে হিজল বনের অপরূপ সৌন্দর্য মনকে মুগ্ধ করে।

গন্ধরাজ ও বেল : গন্ধরাজ ফুলের অতুলনীয় সুগন্ধ রাতের বাতাসকে মৌ মৌ করে তোলে। বেলফুলের সাদা সারল্য আর অপার্থিব গন্ধ বাঙালির ঘরে পবিত্রতার প্রতীক।

কদম : জ্যৈষ্ঠের শেষ দিকে একটু বৃষ্টি হলেই ফোটে কদম ফুল। গোলাকার হলুদ-সাদা এই ফুল বর্ষার আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। কদম ফুলের কথা ছাড়া রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনী যেন অসম্পূর্ণ।

উৎসব ও পার্বণের মাস:
জ্যৈষ্ঠ মাস শুধু ফলের মাস নয়, এটি উৎসব-পার্বণেরও মাস। বাঙালির সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে এই মাসের কয়েকটি বিশেষ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জামাইষষ্ঠী:
জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে পালিত হয় বাঙালির এক অনন্য সামাজিক উৎসব — জামাইষষ্ঠী। হিন্দু বাঙালি পরিবারে এই উৎসব বিশেষ মর্যাদার সাথে পালিত হয়। মায়েরা এই তিথিতে তাদের সন্তান ও জামাইয়ের মঙ্গল কামনায় ষষ্ঠী দেবীর পূজা করেন।
এই উৎসবে শ্বশুরবাড়িতে জামাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। নানা রকমের রান্না, মিষ্টান্ন, মৌসুমি ফলের সম্ভার দিয়ে জামাইকে আপ্যায়ন করা হয়। জামাই-ষষ্ঠীতে জামাইয়ের ললাটে চন্দন, ধান-দুর্বা দেওয়া এবং নতুন পোশাক উপহার দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। এই উৎসব কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয় — এটি পারিবারিক বন্ধন ও ভালোবাসার এক উষ্ণ উদযাপন। বর্তমানে মুসলমান বাঙালি পরিবারেও সামাজিক উৎসব হিসেবে এই দিনটি উদযাপিত হতে দেখা যায়।

বুদ্ধ পূর্ণিমা:
জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা তিথি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। এই তিথিতেই গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। এই ত্রিপবিত্র ঘটনার কারণে জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমাকে বৌদ্ধরা 'ত্রিস্মৃতি তিথি' বলে আখ্যায়িত করেন।
বুদ্ধ পূর্ণিমায় বৌদ্ধ বিহারগুলোতে প্রদীপ জ্বালানো হয়, প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয় এবং ধর্মীয় সভার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে এবং পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ আড়ম্বরে এই উৎসব পালিত হয়।

সাবিত্রী ব্রত ও অন্যান্য আচার:
জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যায় বাঙালি হিন্দু মহিলারা পালন করেন সাবিত্রী ব্রত বা বট সাবিত্রী পূজা। স্বামীর দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনায় এই ব্রত পালিত হয়। বটগাছকে পবিত্র মনে করে তার চারপাশে সুতো বেঁধে প্রদক্ষিণ করা হয় এবং উপোস থেকে পূজা করা হয়।

গ্রীষ্মের দাহ ও বাঙালির জীবন
জ্যৈষ্ঠ মাস মানেই প্রচণ্ড গরম। খরতাপে পুড়তে থাকে মাঠঘাট, রাস্তায় লু হাওয়া বইতে থাকে। তবে এই গ্রীষ্মের দাহকেও বাঙালি নিজের মতো করে সামলে নেয়। মাটির কলসিতে ঠান্ডা জল, আমের শরবত, তালের শাঁস, বেলের শরবত, ডাবের জল — এই পানীয়গুলো গ্রীষ্মের দাবদাহ প্রশমনে বাঙালির চিরকালীন সঙ্গী।
জ্যৈষ্ঠের গরমে গ্রামবাংলায় বটের ছায়ায় মানুষ বিশ্রাম নেয়, পুকুরে স্নান করে শীতল হওয়ার চেষ্টা করে। দুপুরের রান্নায় কাঁচা আমের ডাল, কাঁঠালের তরকারি, আমের চাটনি — এই রান্নাগুলো যেন জ্যৈষ্ঠের সাথেই একাত্ম হয়ে গেছে বাঙালির রান্নাঘরে।
বাংলার কৃষিজীবী মানুষের কাছে জ্যৈষ্ঠ মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে আউশ ধানের বীজতলা তৈরি হয়, পাটের জমিতে চারা বড় হয়। বৃষ্টির প্রতীক্ষায় কৃষকরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। একটু বৃষ্টি হলেই কদমফুল ফুটে ওঠে, মেঘের গন্ধে ভরে যায় চারদিক — বর্ষার পূর্বাভাসে কৃষকের মনে আসে স্বস্তি।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জ্যৈষ্ঠ:

বাংলা সাহিত্যে জ্যৈষ্ঠ মাসের উপস্থিতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় বারবার এসেছে গ্রীষ্মের দুপুর, আমবাগান, ফুলের গন্ধ আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। তাঁর 'আমার সোনার বাংলা' গানেও ফুলে-ফলে ভরা এই বাংলার ছবি আছে।
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বাংলার প্রকৃতির যে অসাধারণ ছবি আছে, তাতে জ্যৈষ্ঠের আম-কাঁঠালের বন, হিজল-করবীর বাগান বারবার ফিরে আসে। কাজী নজরুল ইসলামের গানে গরমের দুপুর, ঝড়ের আভাস আর প্রেমিকার অপেক্ষায় কাটানো মধুর সময়ের কথা পাওয়া যায়।
বাংলার লোকসংস্কৃতিতেও জ্যৈষ্ঠ মাসের গান, ছড়া ও প্রবাদের অভাব নেই। 'জৈষ্ঠে ধান, আষাঢ়ে জল, শ্রাবণে বান' ---এমন অনেক প্রবাদ গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে। লোকগীতিতে কোকিলের সুর, আমের বনের গন্ধ আর প্রিয়জনের প্রতীক্ষার যন্ত্রণা -সব মিলিয়ে জ্যৈষ্ঠ বাংলার লোকসংস্কৃতিকে করে তুলেছে সমৃদ্ধ।

মধুমাসের ফলের পুষ্টিগুণ:
জ্যৈষ্ঠ মাসের ফলগুলো শুধু সুস্বাদু নয়, পুষ্টিগুণেও অতুলনীয়। এই ফলগুলো গরমে শরীরকে সুস্থ ও সতেজ রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে:
আম : ভিটামিন এ, সি এবং ই-এর অন্যতম উৎস। পাকা আমে প্রচুর বিটা-ক্যারোটিন আছে যা চোখের জন্য উপকারী। আম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং হজমে সহায়তা করে।
কাঁঠাল : প্রচুর ফাইবার, পটাশিয়াম ও ভিটামিন বি সমৃদ্ধ। উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ভালো উৎস হওয়ায় নিরামিষভোজীদের জন্য বিশেষ উপকারী।লিচু : ভিটামিন সি এবং অলিগোনল সমৃদ্ধ লিচু হৃদয়ের জন্য উপকারী এবং ত্বক ভালো রাখে।
জাম : রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ জাম ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী বলে বিবেচিত।

উপসংহার:
জ্যৈষ্ঠ মাস বাঙালির জীবনে শুধু একটি মাস নয় - এটি একটি অনুভূতি, একটি স্মৃতি, একটি আবেগ। পাকা আমের গন্ধ, কোকিলের ডাক, বটতলার বিশ্রাম, জামাইষষ্ঠীর উৎসব, বুদ্ধ পূর্ণিমার আলো - সব মিলিয়ে জ্যৈষ্ঠ বাঙালির হৃদয়ে অনন্য একটি জায়গা করে নিয়েছে।
নগরায়ণ ও আধুনিকতার হাওয়ায় অনেক কিছু পাল্টে গেলেও জ্যৈষ্ঠের সাথে বাঙালির সম্পর্ক অটুট রয়েছে। গ্রামে এখনও দাদু-নানুর বাড়িতে আমের ঝুড়ি নিয়ে যাওয়ার রীতি আছে। শহরেও কাঁচা আমের শরবত, পাকা আমের রস মুখে নিলে হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরে আসে। মধুমাসের এই মাধুর্য চিরকাল বাঙালির সত্তার সাথে মিশে থাকবে -এটাই জ্যৈষ্ঠের বাংলা, এটাই মধুমাসের বাংলা।

 

 খোন্দকার শাহিদুল হক

Link copied!