শনিবার ১৩, জুন ২০২৬

১৩ জুন ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম

১৪০ কোটি নয়, ২২০ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে: সম্প্রচার মন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম

1694

ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তনে ‘দেশ পুনর্গঠনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’ শীর্ষক আলোচনা সভা

“বাংলাদেশে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভৌগোলিক সীমারেখার ভেতরে যারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন, আর যারা এই সীমানার বাইরে কথা বলেন—উভয়ের ভাষা এক হলেও মনোজগতে এক বিরাট রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পার্থক্য রয়েছে। আর সে কারণেই আমাদের নিজেদের বাঙালি প্রমাণের জন্য সীমান্তের ওপারে কিংবা কলকাতায় গিয়ে কোনো সার্টিফিকেট নিতে হবে না। আমরা নৃতাত্ত্বিকভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ‘বাংলাদেশি’। আমাদের ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ক, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর দর্শন আমাদের জাতিসত্তার সবচেয়ে বিরাট ও ঐতিহাসিক অর্জন,” বলেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

আজ শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলস্থ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের (আইডিইআই) মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘দেশ পুনর্গঠনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এই জাতীয় আলোচনা সভার আয়োজন করে ‘আমরা বাংলাদেশি’ নামের একটি নবগঠিত জাতীয়তাবাদী আদর্শিক সংগঠন।

নতুন ভারতীয় হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক একটি বিতর্কিত বক্তব্যের পরোক্ষ সমালোচনা করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “আপনারা যদি শুধু ওপার বা নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডের ১৪০ কোটি আর এ পারের ২০ কোটি মানুষকে কৃত্রিমভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে চান, তবে আমরা বলবো—আপনাদের দৃষ্টি আরও প্রসারিত করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য আরও বড়; আমাদের সার্ক (SAARC) অঞ্চলের সামগ্রিক ২২০ কোটি মানুষকে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যারা এই আঞ্চলিক মেলবন্ধন চাইবে না এবং একটি সুনির্দিষ্ট দেশের আধিপত্য চাপিয়ে দিতে চাইবে, আমরা নিশ্চিতভাবেই তাদের সন্দেহের চোখে দেখবো। আমরা আমাদের স্বাধীন ভূখণ্ড রক্ষা করে আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য ‘সার্ক’ এবং আন্তর্জাতিকভাবে ‘জাতিসংঘ’-এর ফ্রেমওয়ার্ক অনুসরণ করেই মাথা উঁচু করে বিশ্বমঞ্চে এগোতে চাই।”

জহির উদ্দিন স্বপন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “যখন দেশ ও জাতি ফ্যাসিবাদের চরম সংকটে নিমজ্জিত ছিলো, তখনই এই জাতিকে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করেন আমাদের দূরদর্শী নেতা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আন্দোলনের সময় তাঁর দেওয়া সেই কালজয়ী স্লোগান—‘দেশ যাবে কোন পথে, ফয়সালা হবে রাজপথে’ এবং ‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি ঘুরে দাঁড়াও তবে তুমিই বাংলাদেশ’—এসব স্লোগানই কিন্তু আমাদের ছাত্র-জনতাকে জুলাই আন্দোলনে বুক পেতে দেওয়ার অদম্য শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে ফ্যাসিবাদ মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য একটি জাতীয় নির্বাচন আদায় করতে পেরেছি।”

তিনি আরও বলেন, “অতীতের রাবার স্ট্যাম্প বা ডামি সংসদের তুলনায় বর্তমান সংসদ সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় শতভাগ জনকল্যাণে কাজ করছে। তবে, ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কে আমাদের প্রকৃত বন্ধু কিংবা কারা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদি বন্ধু, কূটনৈতিকভাবে সেটা আমাদের নিখুঁতভাবে বের করতে হবে। আর সেজন্যই ‘আমরা বাংলাদেশি’ সংগঠনের সময়োপযোগী সূচনা। আগামী ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সর্বশেষ মহান ছাত্র-জনতার বিজয় ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির সেই পুণ্য দিবসেই দেশব্যাপী ‘আমরা বাংলাদেশি’ সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারে।”

সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “আজকাল যারা অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার অলীক ও অবাস্তব কথা বলছেন, তারা আসলে কোন গোপন এজেন্ডা বা ক্ষতিকর মিশন নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন—তা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। বাংলাদেশে নিযুক্ত যেকোনো বিদেশি কূটনীতিকের এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন, উসকানিমূলক ও আপত্তিকর মন্তব্য পরিহার করা উচিত।” দেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের মতো উদীয়মান দেশের জন্য বর্তমান বাজেট খুব একটা বড় বা অবাস্তব বাজেট নয়। তবে এটি বাস্তবায়নে সরকারের সামর্থ্যের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। কেবল আকাশ কিংবা পাহাড়ের চূড়ার দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে বসে থাকলে চলবে না, সেখানে পৌঁছানোর জন্য প্র্যাক্টিক্যাল কাজ শুরু করতে হবে।”

ডাকসুর সাবেক ভিপি এবং গণঅধিকার পরিষদের একাংশের নেতা নূরুল হক নূর বলেন, “ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার স্পষ্ট করে বলেছেন—যেসব সংস্কার ও মৌলিক বিষয়ে দলগুলো একমত ও সম্মত হয়েছে, সেগুলো সরকারে থেকে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে যেসব বিষয়ে নীতিগত দ্বিমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, সেগুলো বাদে। যেহেতু বিএনপি জনগণের বিপুল ভোটে এখন এককভাবে সরকার গঠন করেছে, তাই তারা এসব সংস্কার অনায়াসে বাস্তবায়ন করতে পারে।” তবে দেশের বর্তমান বাস্তবতায় ‘দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ’ গঠন করা যুক্তিযুক্ত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। নতুন বাজেটকে তিনি একটি জনবান্ধব ও কল্যাণের বাজেট এবং নতুন বিএনপি সরকারের শুরুর একটি ‘শুভ সূচনা’ হিসেবে অভিহিত করেন।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জুলাই সনদের পেছনের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, “জুলাই সনদে শুরুতে ‘গণভোট’ (Referendum)-এর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। তবে জাতীয় নির্বাচন যাতে কোনোভাবেই আইনি মারপ্যাঁচে বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে নির্বাচনের একই দিনে গণভোটের বিষয়টি যুক্ত করা হয়। পরে বিএনপি দেশব্যাপী ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালায় এবং প্রায় ৫ কোটি মানুষ ‘হ্যাঁ’ চিহ্নে রায় দিয়েছে। আজকে সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য সংখ্যা গরিষ্ঠ। তারা চাইলে অনায়াসে সংবিধানের প্রয়োজনীয় প্রগতিশীল সংস্কার করতে পারে।” বর্তমান বাজেট জনগণের সামাজিক প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করেছে বলেও তিনি ইতিবাচক মন্তব্য করেন।

বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, “একটি মহল বাজারে রাজনৈতিক অপপ্রচার চালাচ্ছে যে—বিএনপি নাকি রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে নয় বা সংস্কারের বিরোধিতা করছে। অথবা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে দলটি নাকি ভিন্ন কোনো পেছনের চিন্তা করছে। আসলে বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি স্বাক্ষরিত ও প্রতিশ্রুত অংশ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে শতভাগ দায়বদ্ধ।”

তিনি জুলাই পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জুলাই বিপ্লবের পর আমরা আবেগের বশে সরকারের প্রধান হিসাবে একজন সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে দেশের হটসিটে মনোনয়ন করতে পারিনি। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে তাঁর নিজের আন্তর্জাতিক সব সুযোগ-সুবিধা ও স্বার্থ হাসিল করে নিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে দেশকে একটি গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের মুখে ফেলে রেখে হঠাৎ পালিয়ে চলে গেছেন।”

সভাপতির বক্তব্যে বিশিষ্ট বিএনপি নেতা ও সংগঠনের মূল উদ্যোক্তা সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, “বর্তমান ভঙ্গুর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই মূলমন্ত্র ও অটুট বিশ্বাস থেকেই আমরা ‘আমরা বাংলাদেশি’ সংগঠনের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করেছি। যার মূল ভিত্তিই হলো আমাদের আদর্শিক নেতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। আমরা ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং মৌলভীবাজার সীমান্তে বিএসএফ (BSF) কর্তৃক একের পর এক নিরীহ বাংলাদেশি হত্যার ঘটনা আর মুখ বুজে মেনে নেব না। এটা মাথা নত করা পুরোনো বাংলাদেশ নয়, এটি রক্তে কেনা স্বাধীন নতুন বাংলাদেশ।” জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি দৃঢ়তার সাথে পুনর্ব্যক্ত করেন যে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, বিএনপি যেভাবে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে, ঠিক সেভাবেই হুবহু তা বাস্তবায়ন করবে।

তমিজ উদ্দিন টিটুর সুচারু পরিচালনায় সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, তরুণ বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁনসহ অন্যান্য জাতীয়তাবাদী ও জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দ।

Link copied!