শনিবার ১৩, জুন ২০২৬

১৩ জুন ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে সম্পৃক্ত হতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০২৬, ০১:০৩ পিএম

1709

বক্তব্য রাখছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের যৌথ উদ্যোগে ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ের ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ কর্মসূচির প্রথম ব্যাচের উদ্বোধন করা হয়েছে।

রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ড. মিলন হলে আয়োজিত এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু এখন কেবল একটি মৌসুমি রোগ নয়, বরং এটি দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের একার দায়িত্ব নয়; দেশের প্রতিটি নাগরিককে এ লড়াইয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হলেও শতভাগ মশা বা লার্ভা নির্মূল করা অত্যন্ত কঠিন। এডিস মশা দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত উড়তে সক্ষম এবং সামান্য ফাঁকফোকর দিয়েও ঘরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে একটি সর্বাত্মক জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দেশের নালা-নর্দমা, ডোবা, জলাবদ্ধ এলাকা, পরিত্যক্ত স্থানে জমে থাকা পানি এবং কচুরিপানাযুক্ত স্থান নিয়মিত পরিষ্কার না করলে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যকর সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ।

ডেঙ্গুর টিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভ্যাকসিন প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এটি ব্যয়বহুল এবং বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ব্যাপক পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করতে হলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে, যা স্বাস্থ্য খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বর্তমানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, শহর ও গ্রামে অসংখ্য ছোট ছোট স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। পরিত্যক্ত টায়ার, অব্যবহৃত পাত্র, ড্রেন, খাল, রাস্তার গর্ত এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। এসব উৎস চিহ্নিত করে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়মতো প্লাজমা লিকেজ শনাক্ত করা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা। রোগী কখন জটিল অবস্থার দিকে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সতর্ক নজর রাখতে হবে। তিনি জানান, চিকিৎসকদের আধুনিক চিকিৎসা প্রটোকলভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এ জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া হবে।

এ সময় তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, সরঞ্জাম ও চিকিৎসা উপকরণ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী বলেন, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে নিয়মিত সিবিসি পরীক্ষা এবং প্লাজমা লিকেজ পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর অবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, তাই প্রতিটি পর্যায়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনির-উজ-জামান বলেন, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় এবার প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং আগাম প্রতিরোধমূলক কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। রোগের বিস্তার বড় আকার ধারণ করার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনির-উজ-জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেলথ ম্যানেজার ডা. রিয়াদ মাহমুদ। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বক্তব্য রাখেন। কর্মসূচির সার্বিক সমন্বয় করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে দেশে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। অন্যদিকে ২০২৫ সালে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন আক্রান্ত এবং ৪১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান ডেঙ্গুকে দেশের একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে তুলে ধরেছে।

তিন মাসব্যাপী জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিচালিত এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ এবং ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কর্মসূচির পরবর্তী ধাপে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কর্পোরেট হাসপাতাল এবং বেসরকারি খাতের চিকিৎসকদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। পরবর্তীতে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে, যাতে দেশের প্রতিটি স্তরে প্রমাণভিত্তিক ও মানসম্মত ডেঙ্গু চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা যায়।

Link copied!