প্রকাশিত: ০৯ জুন ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
1700
১৪ জুন ২০২৬, ০১:০৩ এএম
মাটি কিংবা কাঠের তৈরি শোপিসের প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে এক সম্পূর্ণ নতুন ও ব্যতিক্রমী ঘরানার শিল্পকর্ম তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন রাজশাহীর রিপন আলী (৪০)। পেশায় তিনি একজন কশাই। কিন্তু গত এক দশক ধরে গবাদি পশুর মাথা সংগ্রহ করে সেগুলোকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নান্দনিক শোপিসে রূপ দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য কৌশল উদ্ভাবন করেছেন তিনি। গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার মাথা বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে তিনি তৈরি করছেন এই শৈল্পিক শিল্পকর্ম। বর্তমানে তাঁর তৈরি এমন শতটিরও বেশি শোপিসের এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে।
শুরুর দিকে পরিবারের বিরক্তি, সাধারণ মানুষের উপহাস ও নানা বাধার সম্মুখীন হতে হলেও দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে রিপন আজ সফল। তাঁর এই অনন্য উদ্ভাবন এখন স্থানীয় দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আকর্ষণের তৈরি করেছে। গত রোববার (৮ জুন) বিকেলে রিপনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি বিশেষ কক্ষে হরেক রকমের শিংওয়ালা পশুর মাথাগুলো থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
রিপন আলী তাঁর এই কাজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, "এ বিষয়ে মানুষ এখনো সেভাবে বিস্তারিত জানে না। আমার সংগ্রহে গরু ও ছাগলের মাথা থেকে তৈরি শোপিসই বেশি। এরপর রয়েছে ভেড়া ও মহিষের শোপিস। বাজার থেকে সব ধরনের শিংওয়ালা মাথা আমি নিই না, কেবল যেগুলো দেখতে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ও অনন্য, সেগুলোই সংগ্রহের জন্য বেছে নেওয়া হয়।"
এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম তৈরির পেছনের গল্পটি প্রায় ১০ বছর পুরোনো। রিপন আলী জানান, কশাইয়ের কাজ করার সময় একদিন রাজশাহীর শালবাগান কশাইপট্টিতে মহিষের একটি বিশাল শিংওয়ালা মাথা তাঁর চোখে পড়ে। ওখানকার কশাই মাথা থেকে শিং আলাদা করে ফেললে তিনি কৌতূহলবশত সেটি নিজের কাছে সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। মহিষের সেই বিশাল শিং দেখে তাঁর কয়েকজন বন্ধু পরামর্শ দেন, প্রাণীর মাথা থেকে তৈরি জিনিসপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে ভবিষ্যতে এগুলো মূল্যবান শোপিস হতে পারে। বন্ধুদের এই চমৎকার ভাবনা থেকেই ২০১৭ সাল থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই কাজ শুরু করেন।
তবে পথটি সহজ ছিল না। পশুর মাথা পচন রোধ করে স্থায়ী রূপ দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি জানতে তিনি অনেক বিশেষজ্ঞ ও পশু চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁকে সঠিক কোনো পরামর্শ দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ কয়েক বছরের কঠোর ব্যক্তিগত পরিশ্রম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে নিজেই এই জটিল পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ আয়ত্ত করেন তিনি।
রিপন স্পষ্ট করে জানান, কাজের উপকরণ হিসেবে তিনি কেবল গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার মতো দেশি গৃহপালিত পশুর মাথা বাজার থেকে চড়া দামে কিনে ব্যবহার করেন। বাঘ বা হরিণের মতো সরকারিভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কোনো বন্যপ্রাণীর অঙ্গ বা চামড়া তিনি কখনোই ব্যবহার করেন না।
শুরুর দিকে পশুর হাড়ের তীব্র দুর্গন্ধ এবং প্রচুর অর্থ ব্যয় হওয়ার কারণে রিপনের ওপর তাঁর পরিবার অত্যন্ত বিরক্ত ছিল। তবে দীর্ঘ ১০ বছরের সাধনার পর এখন পুরো দৃশ্যপট বদলে গেছে। এখন পরিবার ও দর্শনার্থী সবাই তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করছেন।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা থেকে এই শিল্পকর্ম দেখতে আসা মকসেদ আলী বলেন, *"দীর্ঘদিন ধরেই জানি রিপন এই জিনিসগুলো তৈরি করছে। অনেক যত্ন নিয়ে ও নিখুঁতভাবে কাজ করেছে সে, জিনিসগুলো সত্যিই অত্যন্ত মূল্যবান। আমার পছন্দ হলে আজই একটা শোপিস কিনে নিয়ে যাব।"*
আরেক দর্শনার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, *"বাজারে অনেক ধরনের শোপিস দেখেছি, কিন্তু আসল পশুর মাথা ও শিং দিয়ে এমন চমৎকার শোপিস তৈরি এই প্রথম দেখলাম। আইডিয়াটা একেবারেই অনন্য ও আধুনিক।"*
চারঘাট থেকে আসা রাম নামের একজন দর্শনার্থী মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, "এমন শোপিস সচরাচর সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। সাধারণত বড়লোকদের ড্রয়িংরুমে হরিণের মাথা বা চামড়ার শোপিস দেখা যায়। সাধারণ পশুর শিং দিয়ে তৈরি এই শোপিসগুলো দেখে একদম জীবন্ত মনে হচ্ছে, এটি রিপনের সত্যিই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।"
রিপন আলী জানান, তাঁর এই উদ্ভাবনকে একটি বড় শিল্প হিসেবে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়াই এখন তাঁর মূল স্বপ্ন। তাঁর মতে, গৃহপালিত পশুর হাড় ও শিং দিয়ে তৈরি এই নান্দনিক শোপিসগুলো যদি বাজারে সহজলভ্য করা যায়, তবে বিত্তশালী মানুষ বন থেকে বাঘ বা হরিণের মাথা ও চামড়া সংগ্রহের মতো অবৈধ মানসিকতা ও চোরাচালান ছেড়ে দেবে। এটি পরোক্ষভাবে বন্যপ্রাণী হত্যা ও নিধন রোধে আন্তর্জাতিকভাবে বড় সহায়তা করবে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়নের মাধ্যমে একে একটি লাভজনক নতুন শিল্প খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান এই স্বপ্নবাজ কারিগর।