মঙ্গলবার ১৬, জুন ২০২৬

১৬ জুন ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম

কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি শফিকুর রহমানের

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম

1694

জাতীয় সংসদে সরকারের আজ্ঞাবহ ‘বগলদাবা’ কিংবা রাজপথের অন্ধ সংঘাতমুখী কোনো ধরনের নেতিবাচক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন না বলে সাফ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দেশের সাধারণ জনগণের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষায় শতভাগ যৌক্তিক ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকাই পালন করবে তাঁর দল।

আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে জাতীয় সংসদের লেজিসলেটিভ মেম্বার্স (এলডি) হলে আয়োজিত সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

মতবিনিময় সভায় বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, বিরোধী দলের উপনেতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ তাহেরসহ জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

ডা. শফিকুর রহমান দেশের সংসদীয় ইতিহাসের সমালোচনা করে বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের বিরোধী দল দেখা গেছে। এক ধরনের বিরোধী দল ছিল সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ও অনুগত (গৃহপালিত), আর অন্য ধরনের বিরোধী দল সংসদে অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দীর্ঘ সময় ধরে সংসদ বর্জন করার সংস্কৃতি তৈরি করেছিল। জামায়াত এই দুই ধারার কোনোটিই অনুসরণ করবে না।’ তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমরা সরকারের বগলদাবা বিরোধী দল হবো না, আবার এমন কোনো দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণও করবো না যাতে জনস্বার্থ ও সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।”

তিনি বলেন, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিন থেকেই তাঁদের সংসদীয় অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট ‘উই উইল বি রিজনেবল অ্যান্ড লজিক্যাল’ (আমরা হবো যৌক্তিক ও সুশৃঙ্খল)। জনগণের সরাসরি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়েই তারা সর্বদা সংসদে সরব কথা বলবেন।

বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জানান, সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তারা ইতোমধ্যে গণভোটের ফলাফল দ্রুত বাস্তবায়ন, দেশের ভেঙে পড়া ব্যাংকিং খাতের সংকট, রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা এবং সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ কর্তৃক ‘পুশ-ইন’ ইস্যুসহ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোটিশ দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রবাসীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে একটি সর্বদলীয় সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হলেও সরকার এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।

সীমান্তে বিএসএফ-এর পুশ-ইন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, সরকার পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ‘কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল’ উল্লেখ করে নোটিশ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হলেও জামায়াতের সংসদীয় দল তা জাতীয় স্বার্থে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটি প্রথমে বিষয়টি আলোচনার জন্য নির্ধারণ করলেও পরবর্তীতে তা কার্যসূচি থেকে রহস্যজনকভাবে বাদ দিয়েছে। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিষয়টি সংসদে আলোচনার জোর দাবি জানান তিনি।

চলমান বাজেট অধিবেশন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান সরকারের সম্পূরক বাজেট উপস্থাপনের সময়সীমা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সাধারণত মার্চ মাসে সম্পূরক বাজেট আনার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও জুনের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা তড়িঘড়ি করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে বাজেটের ওপর আর্থিক জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়।

বিরোধী দলীয় নেতা অভিযোগ করে বলেন, অর্থবছরের একদম শেষ দিকে এসে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ তড়িঘড়ি করে ব্যয়ের ফলে আমলাতান্ত্রিক অপচয় ও অনিয়মের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়। ভরা বর্ষাকালে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, কাদা-পানিতে এ সময় সরকারি কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এই সংকট থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের বর্তমান ফিসকাল ইয়ার (অর্থবছর) প্রচলিত ‘জুলাই-জুন’-এর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক নিয়মে ‘জানুয়ারি-ডিসেম্বর’ করার দূরদর্শী প্রস্তাব দেন তিনি। বিরোধী দলীয় নেতা মনে করেন, এতে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও দেশের সার্বিক ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অনেক বেশি কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা আসবে।

সংসদীয় আচরণের বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ব্যক্তিগত কাদা ছোঁড়াছুড়ি, দলীয় চরিত্রহনন বা সরকারের অন্ধ ও অযথা প্রশংসা-স্তুতিতে সংসদের মূল্যবান সময় নষ্ট করা মোটেও উচিত নয়। ‘আমরা এখানে সংসদে কারও ব্যক্তিগত প্রশংসা করতে বা হাততালি দিতে আসিনি, জনগণের আসল কথা বলতে এসেছি,’ বলেন তিনি।

মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে বর্তমান সংসদকে ‘মিলমিশের সংসদ’ বা সমঝোতার সংসদ আখ্যা দেওয়ার ধারণা পুরোপুরি নাকচ করে দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সরকারের যেকোনো যৌক্তিক বা জনকল্যাণমূলক বিষয়ে সমর্থন দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রীয় ভুলের কঠোর সমালোচনা করাই একটি কার্যকর ও আদর্শ সংসদীয় বিরোধী দলের মূল দায়িত্ব। কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিরোধী দলের যৌক্তিক মতামত উপেক্ষা করা হলে তারা প্রতিবাদস্বরূপ সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে পারেন, তবে দীর্ঘমেয়াদে সংসদ বর্জন করে জনগণের টাকা অপচয়ের অগণতান্ত্রিক পথে তারা হাঁটবেন না।

সবশেষে সংসদে বহুল আলোচিত ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’ গঠনের সরকারি প্রস্তাব সম্পর্কে জামায়াত আমির বলেন, জামায়াত সামগ্রিক সংবিধান হুট করে ‘সংশোধনের’ চেয়ে রাষ্ট্রীয় শাসন কাঠামোর গুণগত ‘সংস্কারের’ পক্ষে। সংবিধানের সার্বিক সংস্কারের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব সরকারের পক্ষ থেকে এলে জামায়াত তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।

Link copied!