বৃহস্পতিবার ১৮, জুন ২০২৬

১৮ জুন ২০২৬, ০২:৫১ এএম

শিশু আয়াত হত্যায় আসামি আবিরের ফাঁসির রায়

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম

1701

চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর সাড়ে তিন বছর আগের ৫ বছরের শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণের পর নির্মমভাবে খুন ও লাশ ছয় টুকরা করার মামলায় একমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক আসামি মো. আবিরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের ঐতিহাসিক আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ বুধবার (১৭ জুন) বেলা একটার দিকে ষষ্ঠ অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ আলী আক্কাস জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের সিনিয়র সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) জালাল উদ্দিন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিজ্ঞ আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনা দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় খুনের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন এবং একই সাথে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। জরিমানার এই অর্থ অনাদায়ে তাকে অতিরিক্ত তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে এবং জরিমানার পুরো অর্থ ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবারকে দেওয়ার জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় ভুক্তভোগীর লাশ গুম ও প্রমাণ ধ্বংস করার অপরাধে আসামিকে আরও ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’ রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় আসামি আবির সরাসরি হাজির ছিলেন। রায় পড়া শেষ হলে আদালতের বিশেষ নির্দেশে কঠোর পুলিশি পাহারায় তাকে সাজা পরোয়ানা মূলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

আদালত তাঁর রায়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডটি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় করা একটি পূর্বপরিকল্পিত, চরম নিষ্ঠুর, নৃশংস, নির্মম এবং সমগ্র সভ্য সমাজে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ঘটনা। এমন অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি না হলে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হবে।

পুলিশ, পিবিআই ও আদালত সূত্রের বিবরণ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরের ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রানার ফুটফুটে কন্যাসন্তান আলিনা ইসলাম আয়াত ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর নিজ বাড়ির সামনে থেকে আকস্মিক নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে ইপিজেড থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পরিবার। পরবর্তীতে অবুঝ শিশুটির পরিবারের আকুল আবেদনে সাড়া দিয়ে ঘটনার রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট।

পিবিআই-এর দীর্ঘ নিবিড় তদন্তে বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক সব তথ্য। তদন্তে জানা যায়, শিশু আয়াতকে অপহরণ ও নৃশংস হত্যার মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তাদের নিজেদের বাড়ির দীর্ঘদিনের ভাড়াটে মো. আবির। এরপর ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বর পিবিআই আবিরকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আবির নিজের মুখে শিশু আয়াতকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ টুকরো করার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন।

পিবিআই-এর তৎকালীন তদন্ত দল জানায়, মূলত কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অসৎ উদ্দেশ্যে আয়াতকে সুকৌশলে অপহরণ করেছিল আবির। কিন্তু পরবর্তীতে শিশুটি চিৎকার করায় এবং পুলিশের নজরদারির কারণে তার সেই মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে সে আয়াতকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, অপরাধ ঢাকতে আবির শিশুটির মরদেহ বাথরুমে নিয়ে ধারালো বঁটি দিয়ে কেটে নির্মমভাবে ছয় টুকরা করে বস্তাবন্দী করে। এরপর অবলীলায় সেই মরদেহের টুকরোগুলো আকমল আলী রোড সংলগ্ন স্লুইসগেট এলাকার সাগরপাড় ও সংলগ্ন খালের নোংরা পানিতে ফেলে দিয়ে প্রমাণ গুম করার চেষ্টা করে। তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর পিবিআই-এর তৎকালীন চৌকস পরিদর্শক মুস্তাফিজুর রহমান আদালতে এই মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে মো. আবির এবং অপরাধে সহায়তা করার অপরাধে তার ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর বন্ধুকে আসামি করা হয়। আসামিদের মধ্যে ওই কিশোরের বয়স কম হওয়ায় বর্তমানে শিশু আদালতে তার পৃথক বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

আজকের এই কাঙ্ক্ষিত রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মামলার বাদী ও নিহত আয়াতের ভাগ্যাহত পিতা সোহেল রানা অশ্রুসিক্ত চোখে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা আদালতের এই রায়ের আদেশে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট ও খুশি। তবে আমাদের একমাত্র চাওয়া, এই নরপিশাচ ও খুনি আবিরের ফাঁসির আদেশ যেন উচ্চ আদালতেও বহাল থাকে এবং তা যেন অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর করা হয়। সমাজে এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুত কার্যকর না হলে অন্য অপরাধীরা এই ধরনের নিষ্ঠুর অপরাধ করতে আরও উৎসাহিত হবে।’

আজ সকাল থেকেই চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম আদালত ভবনের দ্বিতীয় তলার সংশ্লিষ্ট আদালত কক্ষ ও বারান্দায় বিপুলসংখ্যক গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী এবং নিহত শিশু আয়াতের স্বজন ও এলাকাবাসীর উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। রায় ঘোষণার আগে থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে আয়াতের ফাঁসির দাবি সম্বলিত ব্যানার ও প্লাকার্ড হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন নিহতের স্বজনেরা।

Link copied!