প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম
1695
১৮ জুন ২০২৬, ১২:২৮ এএম
বাংলাদেশ পুলিশে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল এবং বিভিন্ন স্বনামধন্য বেসরকারি ব্যাংকে উচ্চ বেতনে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া এক চক্রের দুই সক্রিয় সদস্যকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
আজ বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালের ভেতরে ছদ্মবেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে সিআইডির ঢাকা মেট্রো-পশ্চিম বিভাগের একটি চৌকস দল।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. শাফায়াত হোসেন শেখ (৫৫) ও এনামুল হক আকবর (৬৩)। এর মধ্যে শাফায়াত হোসেন শেখ নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একজন প্রভাবশালী ‘সার্জেন্ট’ হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের মাঝে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতেন।
আজ বিকেলে সিআইডি সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এই অভিযানের রোমহর্ষক বর্ণনা দেন সিআইডির ঢাকা মেট্রো-পশ্চিম বিভাগের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার ড. রুহুল আমিন সরকার। তিনি নিজেই এই অভিযানে ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন।
ড. রুহুল আমিন সরকার বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমি সিআইডি পরিচয় গোপন করে একজন ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থীর আপন "মামা" সেজে রাজারবাগ হাসপাতালের ভেতরে চক্রটির নির্ধারিত স্থানে যাই। সেখানে সাধারণ মানুষের মতো দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পর চক্রের একজন সদস্যের সাথে আমার দেখা হয়। আমি সুকৌশলে তাকে জিজ্ঞাসা করি, চাকরির অগ্রিম টাকাটা আসলে কাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। তখন সে জানায়, টাকা তার কাছে নয়, ভেতরের অন্য এক কর্মকর্তার কাছে দিতে হবে। একই সাথে সে বড়াই করে বলে যে, তারা এর আগেও এভাবে চার-পাঁচজনকে পুলিশে নিশ্চিত চাকরি দিয়েছে। আজ চুক্তি অনুযায়ী অগ্রিম টাকা বুঝিয়ে দিয়ে মেডিকেল চেকআপ সম্পন্ন করলেই আজ সন্ধ্যার মধ্যে জাল নিয়োগপত্র (অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার) হাতে দিয়ে দেওয়া হবে।’
তিনি আরও জানান, ‘কথোপকথনের একপর্যায়ে সিআইডির টিম তাদের নগদ ৫ লাখ টাকা দিতে চায় এবং প্রতারক চক্রটি এর বিপরীতে প্রার্থীকে জিম্মি হিসেবে ব্যাংকের একটি সিকিউরিটি চেক দিতে রাজি হয়। ঠিক তখনই ওত পেতে থাকা সিআইডির অন্য সদস্যরা চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে তাদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে।’
সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি ঢাকা মেট্রো (পশ্চিম) অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জয়নুল আবেদীন বলেন, এই সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রটি মূলত পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে প্রতি প্রার্থীর সঙ্গে ১০ থেকে ১১ লাখ টাকার অলিখিত চুক্তি করত। বিশেষ করে সাম্প্রতিক পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায় মাঠপর্যায়ে যারা অনুত্তীর্ণ (ফেল) হয়েছে, তাদের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে এই চক্রটি টার্গেট করত। তারা শুধু পুলিশেই নয়; একই কায়দায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এবং বিভিন্ন বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ভুয়া নিয়োগ বাণিজ্যের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই চক্রের পেছনে পুলিশের বা অন্য কোনো দপ্তরের ভেতরের কোনো অসাধু কর্মকর্তা জড়িত আছেন কি না এবং আরও কতজন ভুক্তভোগী রয়েছে, তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গ্রেপ্তারকালে আসামিদের হেফাজত থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া নগদ ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং এক চাকরিপ্রার্থীর পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ৫ লাখ টাকার একটি অগ্রিম স্বাক্ষরিত সিকিউরিটি চেক জব্দ করা হয়। সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত মূল হোতা মো. শাফায়াত হোসেন শেখ একজন পেশাদার অপরাধী। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক ব্যাংক চেক জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা এবং একটি নৃশংস হত্যা মামলাও চলমান রয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় একটি নতুন প্রতারণা মামলা দায়েরের পাশাপাশি কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।