প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম
1698
১৮ জুন ২০২৬, ১২:২৭ এএম
দেশের ভারী শিল্প খাতের অন্যতম চালিকাশক্তি স্টিল বা রড উৎপাদন শিল্পের ওপর প্রস্তাবিত বাজেটে আরোপিত অতিরিক্ত ভ্যাট, রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) ও প্রত্যক্ষ কর পুনর্বিবেচনা করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)। অন্যথায় দেশের সামগ্রিক নির্মাণ ও আবাসন খাত বড় ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
আজ বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এ খাতের সংকট উত্তরণে সুনির্দিষ্ট ৫ দফা দাবি উত্থাপন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় স্টিল খাতের অবদান তুলে ধরে সংগঠনের পক্ষ থেকে যে ৫ দফা দাবি জানানো হয়, সেগুলো হলো
১. রড বা স্টিল পণ্য বিক্রয় পর্যায়ে নতুন করে নির্ধারিত মূসক (ভ্যাট) এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত ভাঙা লোহা বা স্ক্র্যাপের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করতে হবে।
২. স্টিল উৎপাদনের অপরিহার্য উপাদান ফেরো-অ্যালয়, রিফ্যাক্টরি সামগ্রী, কারখানার স্পেয়ার পার্টস এবং অন্যান্য উৎপাদন সংশ্লিষ্ট কাঁচামালের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত কর ও রেগুলেটরি শুল্ক পুনর্বিবেচনা করে কমাতে হবে।
৩. স্টিল শিল্পের ওপর প্রস্তাবিত টার্নওভার ট্যাক্স ১ শতাংশের পরিবর্তে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পূর্বের ন্যায় ০.৬ শতাংশ পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।
৪. সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) দ্রুত ও সময়মতো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে স্টিল বা রডের কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে।
৫. স্টিল শিল্পের সামগ্রিক কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে উৎপাদন করের বোঝা কমানো।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প খাতকে শক্তিশালী ও সুরক্ষামূলক নীতিমালার মধ্যে রেখেই সরকারের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশের স্টিল শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা মানে দেশের আবাসন খাত, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকেই শক্তিশালী করা।’
এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু ইতিবাচক সংস্কারের প্রশংসা করে তিনি বলেন, বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বেশ কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ রয়েছে, যা শিল্পমহল সানন্দে স্বাগত জানায়। যেমন আয়কর আইনের ন্যূনতম করসংক্রান্ত ১৬৩ ধারার অধিকাংশ জটিল বিধান বিলুপ্ত করা, আপিল ও হাইকোর্ট রেফারেন্সের ক্ষেত্রে অগ্রিম কর জমার হার (২৯১ ও ২৯৩ ধারা অনুযায়ী) কমানো, বিদেশি ঋণের সুদের ওপর উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং বিদ্যুৎ বিক্রয়ের বিলের ওপর উৎসে কর ৪ শতাংশের পরিবর্তে ৩ শতাংশ নির্ধারণ করার মতো সিদ্ধান্তগুলো দেশে ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ বা ব্যবসা সহজীকরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের জন্য সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিশেষ ধন্যবাদ জানানো হয়।
তবে নেতিবাচক করের বোঝা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এমন এক সময়ে স্টিল শিল্পের ওপর নতুন করে ভ্যাট ও শুল্কের অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা আরোপ করা হয়েছে, যখন পুরো খাতটি ডলার সংকট ও কাঁচামালের চড়া মূল্যের কারণে অত্যন্ত কঠিন বাণিজ্যিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশে স্টিলের বার্ষিক প্রকৃত চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন হলেও কারখানাগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ১ কোটি মেট্রিক টনেরও বেশি। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকায় দেশের অধিকাংশ বড় বড় আধুনিক কারখানা বর্তমানে তাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশেরও কম ক্যাপাসিটিতে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে ফিক্সড কস্ট বা পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র আর্থিক লোকসান ও ব্যাংক ঋণের চাপে জর্জরিত।
ব্যয় বৃদ্ধির এক নিখুঁত হিসাব তুলে ধরে তিনি সংবাদ সম্মেলনে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর কারণে প্রতি মেট্রিক টন স্টিল উৎপাদনে অতিরিক্ত ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা নতুন ব্যয় যুক্ত হয়েছে। এর সঙ্গে দেশের বন্দর চার্জ, রিভার ডিউজ, ল্যান্ডিং চার্জ, জ্বালানি তেলের কারণে পরিবহন ভাড়া ও অন্যান্য ওভারহেড পরিচালন ব্যয় বাড়ার কারণে প্রতি টনে আরও ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ বেড়েছে। এর ওপর আবার প্রস্তাবিত বাজেটের নতুন ভ্যাট, রেগুলেটরি ডিউটি ও উৎসে করের কারণে প্রতি মেট্রিক টনে আরও ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা অতিরিক্ত সরকারি ট্যাক্স যোগ হবে। ফলে সব মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়ের চাপে প্রতি মেট্রিক টন রড উৎপাদনে মোট অতিরিক্ত খরচ ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
তিনি সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং উৎপাদন ও শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই রাজস্ব বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই উপায়। উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের প্রকৃত সুফল পেতে দেশের চলমান মেগা প্রকল্প যেমন জাতীয় সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার, রেলপথ, মেট্রোরেল, সমুদ্রবন্দর, নতুন বিমানবন্দর এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড) দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এসব প্রকল্প দ্রুত গতিতে বাস্তবায়িত হলে দেশে রডের চাহিদা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে, কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সরকারও বিকেন্দ্রীভূত ভ্যাট, শুল্ক ও আয়কর থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে সুস্থ রাজস্ব সোর্স পাবে।
গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োচিত এই বাজেট প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) কেন্দ্রীয় পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, দেশের প্রথম সারির রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকগণ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক রিপোর্টাররা উপস্থিত ছিলেন।