বৃহস্পতিবার ১৮, জুন ২০২৬

১৮ জুন ২০২৬, ০২:৫৮ এএম

দাম ও করহার অপরিবর্তিত, আরও সহজলভ্য হবে তামাকপণ্য: আহছানিয়া মিশন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০২:২৪ পিএম

1697

দাম ও করহার অপরিবর্তিত আরও সহজলভ্য হবে তামাকপণ্য আহছানিয়া মিশন

ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে তামাক ও তামাকজাত পণ্যের ওপর আরোপিত কর ও বিদ্যমান মূল্য কাঠামো জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণে মোটেও যথেষ্ট নয় বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উন্নয়ন সংস্থা ঢাকা আহছানিয়া মিশন। সংগঠনটি স্পষ্ট করে বলেছে, বাজারে সবচেয়ে বেশি চলা নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য নামমাত্র বৃদ্ধি এবং বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম ও করহার সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখার ফলে দেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এসব পণ্যের প্রকৃত মূল্য মূলত আরও কমে যাবে। এর ফলে ক্ষতিকর তামাকপণ্য সাধারণ মানুষের কাছে আরও সস্তা ও সহজলভ্য হবে, যা তরুণ প্রজন্ম ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে তামাকের মারাত্মক ব্যবহার ও আসক্তি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

আজ বুধবার (১৭ জুন) সকালে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা-পরবর্তী ঢাকা আহছানিয়া মিশন আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য ও বাজেট প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়কারী শরিফুল ইসলাম মূল লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

লিখিত বক্তব্যে শরিফুল ইসলাম দেশের মরণঘাতী তামাক বাজারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের সামগ্রিক সিগারেট বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশই একা নিম্নস্তরের সিগারেটের দখলে রয়েছে, যার প্রধান ভোক্তা দেশের চরম দরিদ্র, দিনমজুর ও স্কুল-কলেজগামী তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এই স্তরের প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের দাম মাত্র ২ টাকা বাড়িয়ে ৬০ টাকা থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা শতাংশের হিসাবে মাত্র ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি। অথচ দেশের বর্তমান বার্ষিক মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির হার এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। এর ফলে পরোক্ষভাবে নিম্নস্তরের সিগারেটের প্রকৃত ক্রয়মূল্য আগের চেয়ে আরও কমে গেল, যা এই স্তরের সিগারেটের ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে দেবে।’

আহছানিয়া মিশনের সমন্বয়কারী সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে অবিলম্বে একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করা, প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা করে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা এবং সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হলে চলতি অর্থবছরের তুলনায় সরকারের পক্ষে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত জাতীয় রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। একই সঙ্গে এর চড়া মূল্যের কারণে ব্যবহার কমে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রায় চার লাখ মানুষের অকালমৃত্যু সফলভাবে প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, বাজেটে সিগারেটের মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের দাম কিছুটা বাড়ানো হলেও কর কাঠামোয় কোনো ধরনের মৌলিক বা পদ্ধতিগত সংস্কার আনা হয়নি। এর ফলে মূল্যবৃদ্ধির একটি বিশাল অংশ সরাসরি বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফায় পরিণত হবে এবং তারা এই অর্থ বাংলাদেশে তাদের তামাক ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহার করবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট দীর্ঘমেয়াদি হুমকি।

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গরিব মানুষের ব্যবহার করা বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম এবং করহার বাজেটে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখার ফলে এসব পণ্য আরও বেশি সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে উঠবে, যা বিশেষ করে গ্রামীণ নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। একই সঙ্গে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের লিখিত নিষেধাজ্ঞা ও সুপারিশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর স্বার্থে নতুন নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর নামমাত্র কর আরোপের মাধ্যমে এসব নতুন নেশাজাতীয় পণ্যকে দেশে কার্যত আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে এক নতুন ধরনের ভয়াবহ নিকোটিন আসক্তি বিস্তারের মরণফাঁদ তৈরি করবে।

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত তথ্যে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৫ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সরাসরি ধোঁয়াবিহীন ও ধোঁযাযুক্ত তামাক ব্যবহার করেন এবং তামাকজনিত ফুসফুস ক্যান্সার ও হার্ট অ্যাটাকের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়। কেবল তাই নয়, তামাক ব্যবহারের কারণে দেশে চিকিৎসা ব্যয় ও পরিবেশগত ক্ষতির বার্ষিক আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা তামাক খাত থেকে অর্জিত রাজস্বের চেয়ে অনেক বেশি।

জনস্বার্থে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের নিকট পাঁচ দফা দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়। দাবিগুলো হলো
১. ২০২৬-২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে তামাক কর ও মূল্য কাঠামোর যুগান্তকারী সংস্কার করা।
২. সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে সর্বনিম্ন মূল্য ১০০ টাকা করা।
৩. অ্যাড-ভ্যালুরেম করের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক নিয়মে ‘সুনির্দিষ্ট করপদ্ধতি’ প্রবর্তন করা।
৪. বিড়ি, জর্দা ও গুলের ওপর উচ্চহারে সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য বৃদ্ধি করা।
৫. যুবসমাজকে রক্ষায় নিকোটিন পাউচ ও ই-সিগারেটসহ সব ধরনের উদীয়মান আধুনিক নিকোটিন পণ্য উৎপাদন ও আমদানি বাংলাদেশে চিরতরে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা।

সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ মনে করেন, এই সংশোধনীগুলো বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করলে একদিকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে ও তরুণ প্রজন্ম তামাকাসক্তি থেকে রক্ষা পাবে, অন্যদিকে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় ব্যাপক হারে বৃদ্ধির এক বিশাল সুযোগ তৈরি হবে।

গুরুত্বপূর্ণ এই বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত থেকে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেন বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএসআরএফ) সম্মানিত সভাপতি মাসউদুল হক এবং ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের দূরদর্শী পরিচালক ইকবাল মাসুদসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় তামাক বিরোধী কর্মী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বগণ।

Link copied!